Poetry

কাজী নজরুল ইসলাম এর শক্তিশালী ১০টি কবিতা এবং আবৃত্তি পাতা

কাজী নজরুল ইসলাম এর শক্তিশালী ১০টি কবিতা এবং আবৃত্তি পাতা

আজকে আপনাদের সাথে শেয়ার করব কাজী নজরুল ইসলামের শক্তিশালী 10 টি কবিতা। বর্তমান সময়ে করোনার কারণে আমরা অনেকেই ঘরে বসে থাকি। সে সময় কাটানোর জন্য আমরা অনেক সময় বিভিন্ন ধরনের কবিতা বা গল্পের বই পড়ে থাকে। এর মধ্যে অনেকে রয়েছে যারা কবিতা পছন্দ করেন কিংবা কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা আবৃত্তি করতে ভালোবাসেন। সে সকল ভিজিটর দের জন্য আজকে আমরা দশটি কাজী নজরুল ইসলামের বিখ্যাত কবিতা আপনাদের সাথে শেয়ার করব। আশা করি আপনাদেরও ভালো লাগবে। এছাড়াও কাজী নজরুল ইসলামের সংক্ষিপ্ত জীবনী আপনাদের সাথে শেয়ার করব।কাজী নজরুল ইসলাম এর শক্তিশালী ১০টি কবিতা এবং আবৃত্তি পাতা নিচে দেওয়া হলো।

আরো পড়ুন: বর্ষার দিনে কবিতা

শীতের আগমনে শীতের সুন্দর সুন্দর কবিতা ও ছন্দ

জন্ম কাজী নজরুল ইসলাম- ২৪ মে ১৮৯৯ চুরুলিয়া, বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি, ব্রিটিশ ভারত (বর্তমানে পশ্চিম বর্ধমান জেলা, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত)

মৃত্যু- ২৯ আগস্ট ১৯৭৬ (বয়স ৭৭)ঢাকা, বাংলাদেশ

মৃত্যুর কারণ– পিক্স ডিজিজ

সমাধি –  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ প্রাঙ্গণ

জাতীয়তা     —       ব্রিটিশ ভারতীয় (১৮৯৯-১৯৪৭)ভারতীয় (১৯৪৭-১৯৭৬)বাংলাদেশী (১৯৭৬)

অন্যান্য নাম   –   দুখু মিয়া

নাগরিকত্ব 

ব্রিটিশ ভারতীয় (১৮৯৯–১৯৪৭)ভারতীয় (১৯৪৭–১৯৭৬)বাংলাদেশী (১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৬–২৯ অগাস্ট ১৯৭৬)[২]

পেশা

কবিঔপন্যাসিকগীতিকারসুরকারনাট্যকারসম্পাদক

উল্লেখযোগ্য কর্ম-চল্‌ চল্‌ চল্‌বিদ্রোহীনজরুলগীতিঅগ্নিবীণা (কাব্যগ্রন্থ)বাঁধন হারাধূমকেতুবিষের বাঁশিগজল

আন্দোলন     –      বাংলার নবজাগরণ

দাম্পত্য সঙ্গী

আশালতা সেনগুপ্ত (প্রমিলা)

নার্গিস আসার খানম

সন্তান  

কৃষ্ণ মুহাম্মদ

অরিন্দম খালেদ (বুলবুল)

কাজী সব্যসাচী

কাজী অনিরুদ্ধ

পিতা-মাতা 

কাজী ফকির আহমদ (পিতা)

জাহেদা খাতুন (মাতা)

পুরস্কার জগত্তারিণী স্বর্ণপদক, স্বাধীনতা পুরস্কার

একুশে পদক

পদ্মভূষণ

সামরিক কর্মজীবন

আনুগত্য             ব্রিটিশ সাম্রাজ্য

সার্ভিস/শাখা      ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনী

কার্যকাল              ১৯১৭–১৯২০

পদমর্যাদা            হাবিলদার,ইউনিট ৪৯তম বেঙ্গল রেজিমেন্ট

যুদ্ধ/সংগ্রাম       প্রথম বিশ্বযুদ্ধ

এক নজরে কবিতার নাম

  • আমার কৈফিয়ৎ 
  • অভিশাপ
  • আনন্দময়ীর আগমনে 
  • কুলি-মজুর
  • পথহারা
  • সাম্যবাদী
  • লিচু চোর
  • বিদায়-বেলায়

কাজী নজরুল ইসলাম এর শক্তিশালী ১০টি কবিতা

 আমার কৈফিয়ৎ 

   কাজী নজরুল ইসলাম

বর্তমানের কবি আমি ভাই, ভবিষ্যতের নই ‘নবী’,

কবি ও অকবি যাহা বলো মোরে মুখ বুঁজে তাই সই সবি!

কেহ বলে, ‘তুমি ভবিষ্যতে যে

ঠাঁই পাবে কবি ভবীর সাথে হে!

যেমন বেরোয় রবির হাতে সে চিরকেলে-বাণী কই কবি?’

দুষিছে সবাই, আমি তবু গাই শুধু প্রভাতের ভৈরবী!

কবি-বন্ধুরা হতাশ হইয়া মোর লেখা প’ড়ে শ্বাস ফেলে!

বলে, কেজো ক্রমে হচ্ছে অকেজো পলিটিক্সের পাশ ঠেলে’।

পড়ে না ক’ বই, ব’য়ে গেছে ওটা।

গুরু ক’ন, তুই করেছিস শুরু তলোয়ার দিয়ে দাড়ি চাঁছা!

প্রতি শনিবারী চিঠিতে প্রেয়সী গালি দেন, ‘তুমি হাঁড়িচাঁচা!’

আমি বলি, ‘প্রিয়ে, হাটে ভাঙি হাঁড়ি!’

অমনি বন্ধ চিঠি তাড়াতাড়ি।

সব ছেড়ে দিয়ে করিলাম বিয়ে, হিন্দুরা ক’ন, আড়ি চাচা!’

যবন না আমি কাফের ভাবিয়া খুঁজি টিকি দাড়ি, নাড়ি কাছা!

মৌ-লোভী যত মৌলবী আর ‘ মোল্‌-লা’রা ক’ন হাত নেড়ে’,

‘দেব-দেবী নাম মুখে আনে, সবে দাও পাজিটার জাত মেরে!

ফতোয়া দিলাম- কাফের কাজী ও,

যদিও শহীদ হইতে রাজী ও!

‘আমপারা’-পড়া হাম-বড়া মোরা এখনো বেড়াই ভাত মেরে!

হিন্দুরা ভাবে,‘ পার্শী-শব্দে কবিতা লেখে, ও পা’ত-নেড়ে!’

আনকোরা যত নন্‌ভায়োলেন্ট নন্‌-কো’র দলও নন্‌ খুশী।

‘ভায়োরেন্সের ভায়োলিন্‌’ নাকি আমি, বিপ্লবী-মন তুষি!

‘এটা অহিংস’, বিপ্লবী ভাবে,

‘নয় চর্‌কার গান কেন গা’বে?’

গোঁড়া-রাম ভাবে নাস্তিক আমি, পাতি-রাম ভাবে কন্‌ফুসি!

স্বরাজীরা ভাবে নারাজী, নারাজীরা ভাবে তাহাদের আঙ্কুশি!

নর ভাবে, আমি বড় নারী-ঘেঁষা! নারী ভাবে, নারী-বিদ্বেষী!

‘বিলেত ফেরনি?’ প্রবাসী-বন্ধু ক’ন, ‘ এই তব বিদ্যে, ছি!’

ভক্তরা বলে, ‘নবযুগ-রবি!’-

যুগের না হই, হজুগের কবি

বটি ত রে দাদা, আমি মনে ভাবি, আর ক’ষে কষি হৃদ্‌-পেশী,

দু’কানে চশ্‌মা আঁটিয়া ঘুমানু, দিব্যি হ’তেছে নিদ্‌ বেশী!

কি যে লিখি ছাই মাথা ও মুণ্ডু আমিই কি বুঝি তার কিছু?

হাত উঁচু আর হ’ল না ত ভাই, তাই লিখি ক’রে ঘাড় নীচু!

বন্ধু! তোমরা দিলে না ক’ দাম,

রাজ-সরকার রেখেছেন মান!

যাহা কিছু লিখি অমূল্য ব’লে অ-মূল্যে নেন! আর কিছু

শুনেছ কি, হুঁ হুঁ, ফিরিছে রাজার প্রহরী সদাই কার পিছু?

বন্ধু! তুমি ত দেখেছ আমায় আমার মনের মন্দিরে,

হাড় কালি হ’ল শাসাতে নারিনু তবু পোড়া মন-বন্দীরে!

যতবার বাঁধি ছেঁড়ে সে শিকল,

মেরে মেরে তা’রে করিনু বিকল,

তবু যদি কথা শোনে সে পাগল! মানিল না ররি-গান্ধীরে।

হঠাৎ জাগিয়া বাঘ খুঁজে ফেরে নিশার আঁধারে বন চিরে’!

আমি বলি, ওরে কথা শোন্‌ ক্ষ্যাপা, দিব্যি আছিস্‌ খোশ্‌-হালে!

প্রায় ‘হাফ’-নেতা হ’য়ে উঠেছিস্‌, এবার এ দাঁও ফস্‌কালে

‘ফুল’-নেতা আর হবিনে যে হায়!

বক্তৃতা দিয়া কাঁদিতে সভায়

গুঁড়ায়ে লঙ্কা পকেটেতে বোকা এই বেলা ঢোকা! সেই তালে

নিস্‌ তোর ফুটো ঘরটাও ছেয়ে, নয় পস্তাবি শেষকালে।

বোঝে না ক’ যে সে চারণের বেশে ফেরে দেশে দেশে গান গেয়ে,

গান শুন সবে ভাবে, ভাবনা কি! দিন যাবে এবে পান খেয়ে!

রবে না ক’ ম্যালেরিয়া মহামারী,

স্বরাজ আসিছে চ’ড়ে জুড়ি-গাড়ী,

চাঁদা চাই, তারা ক্ষুধার অন্ন এনে দেয়, কাঁদে ছেলে-মেয়ে।

মাতা কয়, ওরে চুপ্‌ হতভাগা, স্বরাজ আসে যে, দেখ্‌ চেয়ে!

ক্ষুধাতুর শিশু চায় না স্বরাজ, চায় দুটো ভাত, একটু নুন,

বেলা ব’য়ে যায়, খায়নি ক’ বাছা, কচি পেটে তার জ্বলে আগুন।

কেঁদে ছুটে আসি পাগলের প্রায়,

স্বরাজের নেশা কোথা ছুটে যায়!

কেঁদে বলি, ওগো ভগবান তুমি আজিও আছে কি? কালি ও চুন

কেন ওঠে না ক’ তাহাদের গালে, যারা খায় এই শিশুর খুন?

আমরা ত জানি, স্বরাজ আনিতে পোড়া বার্তাকু এনেছি খাস!

কত শত কোটি ক্ষুধিত শিশুর ক্ষুধা নিঙাড়িয়া কাড়িয়া গ্রাস

এল কোটি টাকা, এল না স্বরাজ!

টাকা দিতে নারে ভুখারি সমাজ।

মা’র বুক হ’তে ছেলে কেড়ে খায়, মোরা বলি, বাঘ, খাও হে ঘাস!

হেরিনু, জননী মাগিছে ভিক্ষা ঢেকে রেখে ঘরে ছেলের লাশ!

বন্ধু গো, আর বলিতে পারি না, বড় বিষ-জ্বালা এই বুকে!

দেখিয়া শুনিয়া ক্ষেপিয়া গিয়াছি, তাই যাহা আসে কই মুখে।

রক্ত ঝরাতে পারি না ত একা,

তাই লিখে যাই এ রক্ত-লেখা,

বড় কথা বড় ভাব আসে না ক’ মাথায়, বন্ধু, বড় দুখে!

অমর কাব্য তোমরা লিখিও, বন্ধু, যাহারা আছ সুখে!

পরোয়া করি না, বাঁচি বা না-বাঁচি যুগের হুজুগ কেটে গেলে,

মাথায় উপরে জ্বলিছেন রবি, রয়েছে সোনার শত ছেলে।

প্রার্থনা ক’রো যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ কোটি মুখের গ্রাস,

যেন লেখা হয় আমার রক্ত-লেখায় তাদের সর্বনাশ!

অভিশাপ – কাজী নজরুল ইসলাম

যেদিন আমি হারিয়ে যাব, বুঝবে সেদিন বুঝবে,

অস্তপারের সন্ধ্যাতারায় আমার খবর পুছবে –

বুঝবে সেদিন বুঝবে!

ছবি আমার বুকে বেঁধে

পাগল হয়ে কেঁদে কেঁদে

ফিরবে মরু কানন গিরি,

সাগর আকাশ বাতাস চিরি’

যেদিন আমায় খুঁজবে –

বুঝবে সেদিন বুঝবে!

স্বপন ভেঙে নিশুত্ রাতে জাগবে হঠাৎ চমকে,

কাহার যেন চেনা-ছোওয়ায় উঠবে ও-বুক ছমকে, –

জাগবে হঠাৎ চমকে!

ভাববে বুঝি আমিই এসে

ব’সনু বুকের কোলটি ঘেঁষে,

ধরতে গিয়ে দেখবে যখন

শূন্য শয্যা! মিথ্যা স্বপন!

বেদনাতে চোখ বুজবে –

বুঝবে সেদিন বুঝবে!

গাইতে ব’সে কন্ঠ ছিড়ে আসবে যখন কান্না,

ব’লবে সবাই – “সেই যে পথিক, তার শেখানো গান না?”

আসবে ভেঙে কান্না!

প’ড়বে মনে আমার সোহাগ,

কন্ঠে তোমার কাঁদবে বেহাগ!

প’ড়বে মনে অনেক ফাঁকি

অশ্রু-হারা কঠিন আঁখি

ঘন ঘন মুছবে –

বুঝবে সেদিন বুঝবে!

আবার যেদিন শিউলি ফুটে ভ’রবে তোমার অঙ্গন,

তুলতে সে-ফুল গাঁথতে মালা কাঁপবে তোমার কঙ্কণ –

কাঁদবে কুটীর-অঙ্গন!

শিউলি ঢাকা মোর সমাধি

প’ড়বে মনে, উঠবে কাঁদি’!

বুকের মালা ক’রবে জ্বালা

চোখের জলে সেদিন বালা

মুখের হাসি ঘুচবে –

বুঝবে সেদিন বুঝবে!

                    আনন্দময়ীর আগমনে

                   কাজী নজরুল ইসলাম

আর কতকাল থাকবি বেটী মাটির ঢেলার মূর্তি আড়াল?

স্বর্গ যে আজ জয় করেছে অত্যাচারী শক্তি চাঁড়াল।

দেব–শিশুদের মারছে চাবুক, বীর যুবকদের দিচ্ছে ফাঁসি,

ভূ-ভারত আজ কসাইখানা, আসবি কখন সর্বনাশী?

মাদীগুলোর আদি দোষ ঐ অহিংসা বোল নাকি-নাকি

খাঁড়ায় কেটে কর মা বিনাশ নপুংসকের প্রেমের ফাঁকি।

ঢাল তরবার, আন মা সমর, অমর হবার মন্ত্র শেখা,

মাদীগুলোয় কর মা পুরুষ, রক্ত দে মা রক্ত দেখা।

তুই একা আয় পাগলী বেটী তাথৈ তাথৈ নৃত্য করে

রক্ত-তৃষার ‘ময়-ভুখা-হু’র কাঁদন-কেতন কণ্বে ধরে।-

অনেক পাঁঠা-মোষ খেয়েছিস, রাক্ষসী তোর যায়নি ক্ষুধা,

আয় পাষাণী এবার নিবি আপন ছেলের রক্ত-সুধা।

দুর্বলেরে বলি দিয়ে ভীরুর এ হীন শক্তি-পূজা

দূর করে দে, বল মা, ছেলের রক্ত মাগে দশভুজা।..

‘ময় ভুখা হুঁ মায়ি’ বলে আয় এবার আনন্দময়ী

কৈলাশ হতে গিরি-রাণীর মা দুলালী কন্যা অয়ি!

 কুলি-মজুর

কাজী নজরুল ইসলাম

দেখিনু সেদিন রেলে,

কুলি ব’লে এক বাবু সা’ব তারে ঠেলে দিলে নীচে ফেলে!

চোখ ফেটে এল জল,

এমনি ক’রে কি জগৎ জুড়িয়া মার খাবে দুর্বল?

যে দধীচিদের হাড় দিয়ে ঐ বাষ্প-শকট চলে,

বাবু সা’ব এসে চড়িল তাহাতে, কুলিরা পড়িল তলে।

বেতন দিয়াছ?-চুপ রও যত মিথ্যাবাদীর দল!

কত পাই দিয়ে কুলিদের তুই কত ক্রোর পেলি বল্?

রাজপথে তব চলিছে মোটর, সাগরে জাহাজ চলে,

রেলপথে চলে বাষ্প-শকট, দেশ ছেয়ে গেল কলে,

বল ত এসব কাহাদের দান! তোমার অট্টালিকা

কার খুনে রাঙা?-ঠুলি খুলে দেখ, প্রতি হঁটে আছে লিখা।

তুমি জান না ক’, কিন- পথের প্রতি ধূলিকণা জানে,

ঐ পথ, ঐ জাহাজ, শকট, অট্টালিকার মানে!

আসিতেছে শুভদিন,

দিনে দিনে বহু বাড়িয়াছে দেনা শুধিতে হইবে ঋণ!

হাতুড়ি শাবল গাঁইতি চালায়ে ভাঙিল যারা পাহাড়,

পাহাড়-কাটা সে পথের দু’পাশে পড়িয়া যাদের হাড়,

তোমারে সেবিতে হইল যাহারা মজুর, মুটে ও কুলি,

তোমারে বহিতে যারা পবিত্র অঙ্গে লাগাল ধূলি;

তারাই মানুষ, তারাই দেবতা, গাহি তাহাদেরি গান,

তাদেরি ব্যথিত বক্ষে পা ফেলে আসে নব উত্থান!

তুমি শুয়ে র’বে তেতালার পরে আমরা রহিব নীচে,

অথচ তোমারে দেবতা বলিব, সে ভরসা আজ মিছে!

সিক্ত যাদের সারা দেহ-মন মাটির মমতা-রসে

এই ধরণীর তরণীর হাল রবে তাহাদেরি বশে!

তারি পদরজ অঞ্জলি করি’ মাথায় লইব তুলি’,

সকলের সাথে পথে চলি’ যার পায়ে লাগিয়াছে ধূলি!

আজ নিখিলের বেদনা -আর্ত পীড়িতের মাখি’ খুন,

লালে লাল হ’য়ে উদিছে নবীন প্রভাতের নবারুণ!

আজ হৃদয়ের জমা-ধরা যত কবাট ভাঙিয়া দাও,

রং-করা ঐ চামড়ার যত আবরণ খুলে নাও!

আকাশের আজ যত বায়ু আছে হইয়া জমাট নীল,

মাতামাতি ক’রে ঢুকুক্ এ বুকে, খুলে দাও যত খিল!

সকল আকাশ ভাঙিয়া পড়-ক আমাদের এই ঘরে,

মোদের মাথায় চন্দ্র সূর্য তারারা পড়-ক ঝ’রে।

সকল কালের সকল দেশের সকল মানুষ আসি’

এক মোহনায় দাঁড়াইয়া শোনো এক মিলনের বাঁশী।

একজনে দিলে ব্যথা-

সমান হইয়া বাজে সে বেদনা সকলের বুকে হেথা।

একের অসম্মান

নিখিল মানব-জাতির লজ্জা-সকলের অপমান!

মহা-মানবের মহা-বেদনার আজি মহা-উত্থান,

উর্ধ্বে হাসিছে ভগবান, নীচে কাঁপিতেছে শয়তান!

পথহারা – কাজী নজরুল ইসলাম

বেলা শেষে উদাস পথিক ভাবে,

সে যেন কোন অনেক দূরে যাবে –

উদাস পথিক ভাবে।

‘ঘরে এস’ সন্ধ্যা সবায় ডাকে,

‘নয় তোরে নয়’ বলে একা তাকে;

পথের পথিক পথেই বসে থাকে,

জানে না সে কে তাহারে চাবে।

উদাস পথিক ভাবে।

বনের ছায়া গভীর ভালোবেসে

আঁধার মাথায় দিগবধূদের কেশে,

ডাকতে বুঝি শ্যামল মেঘের দেশে

শৈলমূলে শৈলবালা নাবে –

উদাস পথিক ভাবে।

বাতি আনি রাতি আনার প্রীতি,

বধূর বুকে গোপন সুখের ভীতি,

বিজন ঘরে এখন সে গায় গীতি,

একলা থাকার গানখানি সে গাবে –

উদাস পথিক ভাবে।

হঠাৎ তাহার পথের রেখা হারায়

গহন বাঁধায় আঁধার-বাঁধা কারায়,

পথ-চাওয়া তার কাঁদে তারায় তারায়

আর কি পূবের পথের দেখা পাবে

উদাস পথিক ভাবে।

সাম্যবাদী – কাজী নজরুল ইসলাম

গাহি সাম্যের গান-

যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান

যেখানে মিশছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুস্‌লিম-ক্রীশ্চান।

গাহি সাম্যের গান!

কে তুমি?- পার্সী? জৈন? ইহুদী? সাঁওতাল, ভীল, গারো?

কন্‌ফুসিয়াস্‌? চার্বআখ চেলা? ব’লে যাও, বলো আরো!

বন্ধু, যা-খুশি হও,

পেটে পিঠে কাঁধে মগজে যা-খুশি পুঁথি ও কেতাব বও,

কোরান-পুরাণ-বেদ-বেদান্ত-বাইবেল-ত্রিপিটক-

জেন্দাবেস্তা-গ্রন্থসাহেব প’ড়ে যাও, যত সখ-

কিন্তু, কেন এ পন্ডশ্রম, মগজে হানিছ শূল?

দোকানে কেন এ দর কষাকষি? -পথে ফুটে তাজা ফুল!

তোমাতে রয়েছে সকল কেতাব সকল কালের জ্ঞান,

সকল শাস্র খুঁজে পাবে সখা, খুলে দেখ নিজ প্রাণ!

তোমাতে রয়েছে সকল ধর্ম, সকল যুগাবতার,

তোমার হৃষয় বিশ্ব-দেউল সকল দেবতার।

কেন খুঁজে ফের’ দেবতা ঠাকুর মৃত পুঁথি -কঙ্কালে?

হাসিছেন তিনি অমৃত-হিয়ার নিভৃত অন্তরালে!

বন্ধু, বলিনি ঝুট,

এইখানে এসে লুটাইয়া পড়ে সকল রাজমুকুট।

এই হৃদ্য়ই সে নীলাচল, কাশী, মথুরা, বৃন্দাবন,

বুদ্ধ-গয়া এ, জেরুজালেম্‌ এ, মদিনা, কাবা-ভবন,

মস্‌জিদ এই, মন্দির এই, গির্জা এই হৃদয়,

এইখানে ব’সে ঈসা মুসা পেল সত্যের পরিচয়।

এই রণ-ভূমে বাঁশীর কিশোর গাহিলেন মহা-গীতা,

এই মাঠে হ’ল মেষের রাখাল নবীরা খোদার মিতা।

এই হৃদয়ের ধ্যান-গুহা-মাঝে বসিয়া শাক্যমুনি

ত্যজিল রাজ্য মানবের মহা-বেদনার ডাক শুনি’।

এই কন্দরে আরব-দুলাল শুনিতেন আহবান,

এইখানে বসি’ গাহিলেন তিনি কোরানের সাম-গান!

মিথ্যা শুনিনি ভাই,

এই হৃদয়ের চেয়ে বড় কোনো মন্দির-কাবা নাই।

লিচু চোর – কাজী নজরুল ইসলাম

বাবুদের তাল-পুকুরে

হাবুদের ডাল-কুকুরে

সে কি বাস করলে তাড়া,

বলি থাম একটু দাঁড়া।

পুকুরের ঐ কাছে না

লিচুর এক গাছ আছে না

হোথা না আস্তে গিয়ে

য়্যাব্বড় কাস্তে নিয়ে

গাছে গো যেই চড়েছি

ছোট এক ডাল ধরেছি,

ও বাবা মড়াত করে

পড়েছি সরাত জোরে।

পড়বি পড় মালীর ঘাড়েই,

সে ছিল গাছের আড়েই।

ব্যাটা ভাই বড় নচ্ছার,

ধুমাধুম গোটা দুচ্চার

দিলে খুব কিল ও ঘুষি

একদম জোরসে ঠুসি।

আমিও বাগিয়ে থাপড়

দে হাওয়া চাপিয়ে কাপড়

লাফিয়ে ডিঙনু দেয়াল,

দেখি এক ভিটরে শেয়াল!

ও বাবা শেয়াল কোথা

ভেলোটা দাড়িয়ে হোথা

দেখে যেই আঁতকে ওঠা

কুকুরও জাড়লে ছোটা!

আমি কই কম্ম কাবার

কুকুরেই করবে সাবাড়!

‘বাবা গো মা গো’ বলে

পাঁচিলের ফোঁকল গলে

ঢুকি গিয়ে বোসদের ঘরে,

যেন প্রাণ আসলো ধড়ে!

যাব ফের? কান মলি ভাই,

চুরিতে আর যদি যাই!

তবে মোর নামই মিছা!

কুকুরের চামড়া খিঁচা

সেকি ভাই যায় রে ভুলা-

মালীর ঐ পিটুনিগুলা!

কি বলিস? ফের হপ্তা!

তৌবা-নাক খপ্তা!

মানুষ – কাজী নজরুল ইসলাম

গাহি সাম্যের গান-

মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান,

নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্মজাতি,

সব দেশে, সব কালে, ঘরে-ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।

‘পূজারী, দুয়ার খোলো,

ক্ষুদার ঠাকুর দাঁড়ায়ে দুয়ারে পূজার সময় হ’ল!’

স্বপন দেখিয়া আকুল পূজারী খুলিল ভজনালয়

দেবতার বরে আজ রাজা-টাজা হ’য়ে যাবে নিশ্চয়!

জীর্ণ-বস্ত্র শীর্ণ-গাত্র, ক্ষুদায় কন্ঠ ক্ষীণ

ডাকিল পান্থ, ‘দ্বার খোল বাবা, খাইনি ক’ সাত দিন!’

সহসা বন্ধ হ’ল মন্দির, ভুখারী ফিরিয়া চলে,

তিমির রাত্রি, পথ জুড়ে তার ক্ষুদার মানিক জ্বলে!

ভুখারী ফুকারি’ কয়,

‘ঐ মন্দির পূজারীর, হায় দেবতা, তোমার নয়!’

মসজিদে কাল শিরনী আছিল, অঢেল গোস্ত-রুটি

বাঁচিয়া গিয়াছে, মোল্লা সাহেব হেসে তাই কুটিকুটি!

এমন সময় এলো মুসাফির গায়ে আজারির চিন্

বলে ‘বাবা, আমি ভুকা-ফাকা আছি আজ নিয়ে সাত দিন!’

তেরিয়া হইয়া হাঁকিল মোল্লা – ‘ভ্যালা হ’ল দেখি লেঠা,

ভুখা আছ মর গো-ভাগাড়ে গিয়ে! নামাজ পড়িস বেটা?’

ভুখারী কহিল, ‘না বাবা!’ মোল্লা হাঁকিল – ‘তা হলে শালা

সোজা পথ দেখ!’ গোস্ত-রুটি নিয়া মসজিদে দিল তালা!

ভুখারী ফিরিয়া চলে,

চলিতে চলিতে বলে-

‘আশিটা বছর কেটে গেল, আমি ডাকিনি তোমায় কভু,

আমার ক্ষুদার অন্ন তা’বলে বন্ধ করনি প্রভু

তব মসজিদ মন্দিরে প্রভু নাই মানুষের দাবী,

মোল্লা-পুরুত লাগায়েছে তার সকল দুয়ারে চাবী!’

কোথা চেঙ্গিস্‌, গজনী-মামুদ, কোথায় কালাপাহাড়?

ভেঙে ফেল ঐ ভজনালয়ের যত তালা-দেওয়া-দ্বার!

খোদার ঘরে কে কপাট লাগায়, কে দেয় সেখানে তালা?

সব দ্বার এর খোলা রবে, চালা হাতুড়ি শাবল চালা!

হায় রে ভজনালয়,

তোমার মিনারে চড়িয়া ভন্ড গাহে স্বার্থের জয়!

মানুষেরে ঘৃণা করি’

ও’ কারা কোরান, বেদ, বাইবেল চুম্বিছে মরি’ মরি’

ও’ মুখ হইতে কেতাব গ্রন্থ নাও জোর ক’রে কেড়ে,

যাহারা আনিল গ্রন্থ-কেতাব সেই মানুষেরে মেরে,

পূজিছে গ্রন’ ভন্ডের দল! মূর্খরা সব শোনো,

মানুষ এনেছে গ্রন্থ;-গ্রন্থ আনেনি মানুষ কোনো।

আদম দাউদ ঈসা মুসা ইব্রাহিম মোহাম্মাদ

কৃষ্ণ বুদ্ধ নানক কবীর,-বিশ্বের সম্পদ,

আমাদেরি এঁরা পিতা-পিতামহ, এই আমাদের মাঝে

তাঁদেরি রক্ত কম-বেশী ক’রে প্রতি ধমনীতে রাজে!

আমরা তাঁদেরি সন্তান, জ্ঞাতি, তাঁদেরি মতন দেহ,

কে জানে কখন মোরাও অমনি হয়ে যেতে পারি কেহ।

হেসো না বন্ধু! আমার আমি সে কত অতল অসীম,

আমিই কি জানি-কে জানে কে আছে আমাতে মহামহিম।

হয়ত আমাতে আসিছে কল্কি, তোমাতে মেহেদী ঈসা,

কে জানে কাহার অন্ত ও আদি, কে পায় কাহার দিশা?

কাহারে করিছ ঘৃণা তুমি ভাই, কাহারে মারিছ লাথি?

হয়ত উহারই বুকে ভগবান্‌ জাগিছেন দিবা-রাতি!

অথবা হয়ত কিছুই নহে সে, মহান্‌ উচ্চ নহে,

আছে ক্লেদাক্ত ক্ষত-বিক্ষত পড়িয়া দুঃখ-দহে,

তবু জগতের যত পবিত্র গ্রন্থ ভজনালয়

ঐ একখানি ক্ষুদ্র দেহের সম পবিত্র নয়!

হয়ত ইহারি ঔরসে ভাই ইহারই কুটীর-বাসে

জন্মিছে কেহ- জোড়া নাই যার জগতের ইতিহাসে!

যে বাণী আজিও শোনেনি জগৎ, যে মহাশক্তিধরে

আজিও বিশ্ব দেখনি,-হয়ত আসিছে সে এরই ঘরে!

ও কে? চন্ডাল? চম্‌কাও কেন? নহে ও ঘৃণ্য জীব!

ওই হ’তে পারে হরিশচন্দ্র, ওই শ্মশানের শিব।

আজ চন্ডাল, কাল হ’তে পারে মহাযোগী-সম্রাট,

তুমি কাল তারে অর্ঘ্য দানিবে, করিবে নান্দী-পাঠ।

রাখাল বলিয়া কারে করো হেলা, ও-হেলা কাহারে বাজে!

হয়ত গোপনে ব্রজের গোপাল এসেছে রাখাল সাজে!

চাষা ব’লে কর ঘৃণা!

দে’খো চাষা-রূপে লুকায়ে জনক বলরাম এলো কি না!

যত নবী ছিল মেষের রাখাল, তারাও ধরিল হাল,

তারাই আনিল অমর বাণী-যা আছে র’বে চিরকাল।

দ্বারে গালি খেয়ে ফিরে যায় নিতি ভিখারী ও ভিখারিনী,

তারি মাঝে কবে এলো ভোলা-নাথ গিরিজায়া, তা কি চিনি!

তোমার ভোগের হ্রাস হয় পাছে ভিক্ষা-মুষ্টি দিলে,

দ্বারী দিয়ে তাই মার দিয়ে তুমি দেবতারে খেদাইলে।

সে মার রহিল জমা-

কে জানে তোমায় লাঞ্ছিতা দেবী করিয়াছে কিনা ক্ষমা!

বন্ধু, তোমার বুক-ভরা লোভ, দু’চোখে স্বার্থ-ঠুলি,

নতুবা দেখিতে, তোমারে সেবিতে দেবতা হ’য়েছে কুলি।

মানুষের বুকে যেটুকু দেবতা, বেদনা-মথিত সুধা,

তাই লুটে তুমি খাবে পশু? তুমি তা দিয়ে মিটাবে ক্ষুধা?

তোমার ক্ষুধার আহার তোমার মন্দোদরীই জানে

তোমার মৃত্যু-বাণ আছে তব প্রাসাদের কোন্‌খানে!

তোমারি কামনা-রাণী

যুগে যুগে পশু, ফেলেছে তোমায় মৃত্যু-বিবরে টানি’।

 

বিদায়-বেলায় – কাজী নজরুল ইসলাম

তুমি অমন ক’রে গো বারে বারে জল-ছল-ছল চোখে চেয়ো না,

জল-ছল-ছল চোখে চেয়ো না।

ঐ কাতর কন্ঠে থেকে থেকে শুধু বিদায়ের গান গেয়ো না,

শুধু বিদায়ের গান গেয়ো না।।

হাসি দিয়ে যদি লুকালে তোমার সারা জীবনের বেদনা,

আজো তবে শুধু হেসে যাও, আজ বিদায়ের দিনে কেঁদো না।

ঐ ব্যথাতুর আঁখি কাঁদো-কাঁদো মুখ

দেখি আর শুধু হেসে যাও,আজ বিদায়ের দিনে কেঁদো না।

চলার তোমার বাকী পথটুকু-

পথিক! ওগো সুদূর পথের পথিক-

হায়, অমন ক’রে ও অকর”ণ গীতে আঁখির সলিলে ছেয়ো না,

ওগো আঁখির সলিলে ছেয়ো না।।

দূরের পথিক! তুমি ভাব বুঝি

তব ব্যথা কেউ বোঝে না,

তোমার ব্যথার তুমিই দরদী একাকী,

পথে ফেরে যারা পথ-হারা,

কোন গৃহবাসী তারে খোঁজে না,

বুকে ক্ষত হ’য়ে জাগে আজো সেই ব্যথা-লেখা কি?

দূর বাউলের গানে ব্যথা হানে বুঝি শুধু ধূ-ধূ মাঠে পথিকে?

এ যে মিছে অভিমান পরবাসী! দেখে ঘর-বাসীদের ক্ষতিকে!

তবে জান কি তোমার বিদায়- কথায়

কত বুক-ভাঙা গোপন ব্যথায়

আজ কতগুলি প্রাণ কাঁদিছে কোথায়-

পথিক! ওগো অভিমানী দূর পথিক!

কেহ ভালোবাসিল না ভেবে যেন আজো

মিছে ব্যথা পেয়ে যেয়ো না,

ওগো যাবে যাও, তুমি বুকে ব্যথা নিয়ে যেয়ো না।।